ইয়াল্টা কনফারেন্স

১৯৪৫ সাল ফেব্রুয়ারি মাস। ইউরোপে যুদ্ধ তখন প্রায় শেষ মুখে। আমেরিকা আর ব্রিটেন মিলে পশ্চিম দিক থেকে ফ্রান্স কে নাৎসি দের হাত থেকে মুক্ত করেছে। পূর্বে সোভিয়েত ইউনিয়নের সৈন্যবাহিনী জার্মানদের আরো পশ্চিমে ঠেলে দিয়েছে। দুই দিকের চাপে জার্মান নাৎসিদের হার প্রায় নিশ্চিত। 

রাশিয়ার দক্ষিন পূর্বে ক্রাইমিয়াতে বেশ ঠাণ্ডা তখনও, যদিও কালো সাগরের পাশে থাকার জন্য ইয়ালটা শহরে তখনও অতটা ঠাণ্ডা পড়ে নি। আবহাওয়া বেশ মনোরম। এখানেই মিলিত হবেন মিত্রপক্ষের ৩ সর্বেসর্বা। গ্রেট ব্রিটেন এর প্রধানমন্ত্রী উইনস্টন চার্চিল, আমেরিকার রাষ্ট্রপতি ফ্রাঙ্কলিন রুজভেল্ট ও সোভিয়েত ইউনিয়নের সভাপতি স্টালিন। যুদ্ধ পরবর্তীতে ইউরোপে ভাগ্য নির্ধারণ ও পূর্বে জাপানের বিরুদ্ধে আমেরিকার সথে যুদ্ধে যোগদানের জন্য সোভিয়েতদের রাজি করানোর বিষয়ে এই মিটিং। 

পরাজয় নিশ্চিত জেনে Germany কে আমেরিকা, ব্রিটেন ও সোভিয়েত রাশিয়া নিজ নিজ প্রভাব ক্ষেত্রের হিসেবে ভাগ করে নেয়। প্রথমে ফ্রান্স কে এর থেকে দূরে রাখা হলেও পরে তাদেরও দক্ষিণ পূর্ব জার্মানি এর খানিকটা অংশ দেওয়া হয়। এমনকি রাজধানী বার্লিন কেও ৪ অংশে ভাগ করা হয়। 

যুদ্ধ পরবর্তী ইউরোপের কি হবে সেই সম্পর্কেও এখানে আলোচনা হয়। যেহেতু অতীতে জার্মানি ও অন্যান্য ইউরোপীয় শক্তি একাধিক বার পোল্যান্ড ও তার পূর্বের সমতল ভূমির উপর দিয়ে রাশিয়ার উপরে আক্রমণ চালায় তাই পোল্যান্ড, ও সমগ্র পূর্ব ইউরোপে রাশিয়ার সাথে "মিত্রতাপূর্ণ" সরকার গঠন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। স্টালিন কথা দেন যে এখানে পরে স্বাধীন ও সতন্ত্র নির্বাচনও করা হবে। যদিও তিনি এই কথা কোনো দিনও পালন করেন নি। তাই পরবর্তীতে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী চার্চিল রাশিয়ার প্রভাবওধিন পূর্ব ইউরোপকে "লোহার পর্দায় ঢাকা" দেশের উপাধি দেন।

পরবর্তীতে আর এইরকম ভয়াবহ যুদ্ধ না হয় তার জন্য রাষ্ট্রসঙ্ঘের প্রস্তাবও এই মিটিংয়ে আনা হয়। যার প্রথম পাঁচ স্থায়ী সদস্য হয় আমেরিকা, ব্রিটেন, ফ্রান্স, রাশিয়া ও চীন। 

যদিও পশ্চিমে যুদ্ধ প্রায় গুটিয়ে এসেছিল কিন্তু তখনও পূর্বে জাপান সাম্রাজ্যের সাথে আমেরিকাকে যুদ্ধে বেশ বেগ পেতে হচ্ছিল। জাপান জানতো যে তারা কোনোদিন আমেরিকার সাথে লড়াইয়ে পেরে উঠবেনা। তাই তারা যতটা সম্ভব আমেরিকানদের ক্ষতি করার জন্য সুইসাইড মিশনএ পর্যন্ত যেতে প্রস্তুত ছিলো। অনেক সময় তারা এরোপ্লেনএ বোমা বেঁধে সেগুলিকে নিয়ে আমেরিকার যুদ্ধ জাহাজের উপর ফেলত। এতে পাইলট সহ অনেক আমেরিকান সেনা মারা যেতো। এটাকে "কামাকাজি" অ্যাটাক বলা হতো। জাপান কোনো মতেই আত্মসমর্পণ করতে প্রস্তুত ছিলনা। এমনকি জাপানি সাহিত্যে "আত্মসমর্পণ" বা তার কাছাাছি কোনো শব্দও ছিলোনা। তাই জাপানিদের সাথে মোকাবিলা করতে আমেরিকার রাশিয়ার সাহায্যের প্রয়োজন ছিলো। কিন্তু রাশিয়াও এমনি এমনি সাহায্য করবে না। রাশিয়ার সাহায্যের পরিবর্তে উত্তর পূর্ব চীনের মঞ্চুরিয়া ও উত্তর কোরিয়াকে যুদ্ধের পরে রাশিয়ার অধীনে রাখার কথা দেওয়া হয়। তার সাথে মঙ্গোলিয়াকে স্বাধীন করে সেখানে কমিনুষ্ট সরকার মোতায়ন করা হয়। 

দেখা যাচ্ছে যে ইয়েলটা কনফারেন্স সবথেকে বেশি লাভজনক পরিস্থিতে ছিলো রাশিয়া। যদিও মিটিং চলাকালীন তিনজনের মধ্যে হাসি মজা চলতে থাকে, কিন্তু অনেকে বলেন যে এই মিটিংয়ে পরবর্তী শীত যুদ্ধের বীজ লুকিয়েছিল। আর এই কারণেই অনেক আমেরিকান মনে করেন যে রুজভেল্ট প্রায় নিজের হাতেই পূর্ব ইউরোপ স্টালিনের হাতে তুলে দেন। আরও বড় জনিস যে এই মিটিং এর কিছুদিন পরই এপ্রিলে রুজভেল্ট মারা যান। তার পরবর্তী রাষ্ট্রপতি ট্রুম্যান মোটেই স্টালিন কে ভালো চোখে দেখতেন না। অনেকেই গুজব রটান যে এই মিটিংএ রুজভেল্টকে বিষ দেওয়া হয়। যদিও এর প্রমাণ ও সত্যতা কোনোদিনও পাওয়া যায় নি। 

শেষে একটা ছোট্ট ঘটনা বলি। মিটিং শেষে রুজভেল্ট স্টালিন ও চার্চিল বাইরের লনে বসে কথা বলছিলেন। কিছু নিউজ রিপোর্টার স্টালিনকে প্রশ্ন করেন, "এত সহজে আপনি অর্ধেক জার্মানি ও পূর্ব ইউরোপ পেয়ে গেলেন। আপনি নিশ্চয়ই খুব অপ্লুত?" স্টালিন ফটকরে জবাব দেন, "জার আলেকজান্ডার প্রথম, নেপোলিয়ানের পিছু ধাওয়া করে প্যারিসও দখল করেছিলেন।" রিপোর্টার চুপ হয়ে যান। হয়তো এটাই আগামী সময়ের আমেরিকা ও সোভিয়েত এর মধ্যের গভীর হতে থাকা দূর্রতের প্রথম ইঙ্গিত ছিলো। 

Comments

Popular posts from this blog

how salesman fools our brain

Srilankan debt crisis